যে প্রাপ্তি সুখকর নয়

প্রফেসর ডা. মেজর (অব.) আব্দুল ওহাব মিনার :

আজকের দিনটা শুরু হয়ে যেভাবে শেষ হয়ে গেলো এই মহাবিদ্যালয়ের পঞ্চাশটা বছর গুনে গুনে এভাবেই শেষ হয়ে গেছে৷
১৯৬৮ থেকে ২০১৮৷
অনেকেই প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন যেন বসন্তের হলুদ ঝরা পাতা উড়ে উড়ে যায়, কে কোথায় হারায় বেলায়-অবেলায়!

প্রথম ব্যাচ থেকে পঞ্চাশতম ব্যাচ৷
প্রবীণ নবীনদের এই মিলনমেলায় উচ্ছাস যেমন ছিল তেমন মুখ ভার করা বিষাদে নীল লোকের দেখাও মিলেছে৷
আড়ালে চোখ মুছতেও অনেককে দেখেছি৷
আরাফাতের মাঠে বৃদ্ধা মাকে হারিয়ে ছেলের হন্নে হয়ে খুঁজে ফেরার মতো সবাই কি যেন খুঁজছে প্রিয় ক্যাম্পাসে৷ নীরবে বয়ে চলা চিন চিন ব্যাথা – যাকে চেতনে আনলেই ঝড় শুরু হবার আতংকে প্রিয় মুখগুলো এড়িয়ে চলছে৷

খুঁজাখুঁজির গল্প কেউ কাউকে করে না – অথচ দেখা হয়ে যায় এক নম্বর হোস্টেলের পিছনের রাস্তায়৷ চায়নার বাড়ি খুঁজতে গিয়ে, যাবার আগে পাঁচ বছরের শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে গেলে তার সাখ্যাত পেতে তাড়নায় দেখা হয়ে যায়৷ লেডিস হোস্টেলে পাঁচ বছর কাজ করেছে যে মহিলা তার মেয়ে, জামাই, নাতিদের খোঁজ নিতে গিয়ে অন্য অনুষ্ঠান মিস৷ সেই পান খাওয়া মহিলার শেষ আব্দারটাও রক্ষা করেছেন আজকের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপিকা৷ অপার শ্বশুর বাড়ি দেখার বায়না করেছিলেন আজিমন বিবি ৷ আপার এখন মনে হচ্ছে পান খাওয়ার মতো একটা ছোট্ট আবদারকে তিনি আমলে নিতে পারতেন৷ এ ছাড়া সব চাওয়াকে তিনি পূরণ করেছেন বলে দাবি করে আমাকে প্রশ্ন করলেন ” সুবর্ণ জয়ন্তীতে এটা আমার কি কোনো অর্জন নয় ?”
– জি, অনেক বড় অর্জন৷ অনেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে ভালো লাগার জায়গা গুলোতে, স্মৃতির আস্তরন পরে আছে এমন জায়গাগুলোতে ঘুরতে গিয়েছে, ঘুরে এসেছে৷ তাদের মিশ্র অনুভূতি – হাসিমুখ বেদনার চোখ৷
এ ভাবেই আমরাদের প্রায় সবাই হারানো দিন, পুরানো মানুষ, স্মৃতির মক্তব খুঁজতে বেরিয়েছিলেন৷

প্রথম বর্ষে ভর্তি হলে সবাই কাঠপট্টি রোডের বাকু ব্রাদার্স থেকে খাকি কালারের হাফ বাঁধানো খাতা কেনে৷ আমি কিনেছি একদিন৷ অন্যদিন বন্ধুদের চিনিয়ে দেয়ার জন্য সাথে যেতাম৷ অনেক খুজলাম, পেলাম কই! সেখানে একটা প্রেস৷
বুকভিলা বিবির পুকুর পারে এখনো আছে৷ অনেক গল্প উপন্যাস কবিতার বই কিনেছি এখন থেকে৷ স্মৃতির আরেক ঘর ফরিদ ভাইর ইন্দ্রপুরী ষ্টুডিও৷ ক্যামেরা থাকা বা ছবি তোলাই এনাফ না৷ বাড়ি থেকে আনা মাসের অর্ধেক টাকা যেত ছবি ওয়াশ করাতে৷ তারপরও ভাল লাগতো যখন ছবিগুলো হাতে পেতাম! ষ্টুডিও আছে, নেই হাসিখুশি লম্বা গড়নের ফরিদ ভাই৷

মোল্লার ক্যান্টিনে কেউ যায়, খুঁজে পায় না৷ ক্যান্টিনতো তেমন নেই৷ থাকার কথাও না৷ চেয়ার টেবিল, ক্রোকারিজ ত্রিশ চল্লিশ বছর আগের কি থাকে? নতুন গ্রাহক, নতুন দোকানি – সময়ের তালে সাজের ভিন্নতা আছেই৷ কিন্তু আমরা বৃদ্ধরা খুজঁছিতো সেই মোল্লাকে যে মোল্লা আল্লাহর কাছে পৌঁছে গেছেন অনেক আগেই৷
টিবির রোগী শীর্ণকায় মোল্লাইতো নেই৷ বিড়ি মুখের মোল্লাকেন্দ্রিক সেই কেন্টিন কৃষ্টি পুরোই অনুস্পস্থিত৷
কানে এখনো বাজে “এই মিনার সাহেবকে গরম পরোয়াটা দিস৷”

এমনিভাবে আমাদের থাকার জায়গা গুলোর আধুনিকায়ন হয়েছে৷ এনিম্যাল হাউজে সাব্বির, ফরিদ, কামাল, লিয়াকত থাকতো৷ এখন ছাত্র নয় এনিম্যালরাই থাকে৷
জিমন্যাশিয়াম, কমন রুম, চিলে কোঠায় কোন প্রথম বর্ষের ছাত্ররা থাকে না, অবস্থার উন্নতি হয়েছে৷ এক নম্বর ছাত্রাবাসের চিলেকোঠা নেই, একটা আস্ত ফ্লোর বানিয়ে ফেলেছে৷ খুঁজে ফিরলাম অতীত৷ সেই মানুষগুলোকে নিয়ে যাদের সুখ দু:খ দীর্ধ ছয় বছর একত্রে কেটেছে৷ একটা পর একটা হোস্টেলের সামনে গেলাম কতশত কথা, কথার পিঠে কথা – বিপ্লব, মানিক, সারওয়ার, শওকত, অজয়, তাহা, বাবুল শুধু গল্পই করে যাচ্ছে৷

জোহরের নামাজ পরে রফিক ভাইর অপেক্ষায় থাকতাম৷ রফিক ভাই আমাদের অপেক্ষার ধরণ দেখে বেশ মজা পেতেন৷ চিঠি পাবার অপেক্ষা৷ চিঠিতে নেশা ছিল আমাদের অনেকেরই৷ টানা কয়েকদিন ধরে চিঠি না এলে “উইথড্রল সিম্পটম” হতো৷ কারো হাতে লেখা একটা চিঠি খাকি খামে যার আসে সেজন ধন্য৷ খামের মধ্যে একটা কাগজে অর্থহীন, প্রসঙ্গবিহীন বানান ভুলের দুটো লাইন যদি শত্রু পক্ষও লিখে পাঠায় তাকে আলিঙ্গন করতে দ্বিধা থাকবে না- তেষ্টাটা ছিল সে পর্যায়ের৷ চিঠি কৃষ্টি বন্ধ হওয়াতে কার কি ক্ষতি হয়েছে জানি না আমি বিশ্বাস করি আসল লেখার প্র্যাকটিসটা ওই চিঠি আদান প্রদান, সম্পর্কের জোয়ার উজানের উপর, জীবনের উত্থান পতনের মধ্যে দিয়েই এগোয়৷ তাই প্রাকৃতিক নিয়মে কিছু সংস্কৃতির বিলুপ্তিতে কষ্ট পাই৷
আজকাল ডাকের চিঠি কালেভদ্রে আসে৷ রফিক ভাই চাকরিতে অবসর নিয়েছেন৷ শুনেছি তিনি আমাদের নাম ধরে স্মরণ করেন৷

দেখলাম লাইব্রেরি, রিডিং রুম৷ লোকজন না থাকলে টেবিল, বুকসেলভের ঘ্রান নিতাম৷ মসজিদে না গেলেও, নামাজ না পড়লেও এক শ্রেণী লোকের মসজিদ, আজান, নামাজের প্রতি নামাজিদের চে বেশি ভক্তি থাকে৷ তাদের ধর্মীয় এসব ব্যাপারগুলোতে শ্রদ্ধার অভাব থাকে না৷ কোনদিন লাইব্রেরি ওয়ার্ক না করেও দোতলায় অবস্থিত এই জায়গাটার প্রতি আমার শ্রদ্ধা অশেষ৷ এটা আগে ছিল না৷ পোস্ট গ্রাজুয়েশনের পড়ালেখা শুরুর পর বুঝতে শিখেছি পেশাজীবীদের জন্য পড়াশুনায় অনেক মজা, জ্ঞানের সাথে এখানে পরিতৃপ্তির মাত্রা সমান্তরাল বয়৷ লাইব্রেরিতে গিয়ে আবেগ প্রবন হয়ে গেলাম৷ বিভিন্ন ব্যাচের ছেলে মেয়েরা বসে গল্প করছে ওষুধ কোম্পানির বিলিকৃত মাগনা আইসক্রিম খাচ্ছে, পপকর্ন, স্বরূপকাঠির আমড়া ঝাল, বিস্কুট- ওয়েফার, চা কফি, কোল্ড ড্রিংকসতো আছেই৷

আছে সেই পুকুর, মসজিদ, খেলার মাঠ৷
কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো ইতিহাসের স্বাক্ষী৷ আছে সেই গোড়া থেকেই৷ গ্রীষ্মে কৃষ্ণচূড়ার আগুনঝরা সে কি রূপ! মে মাসে প্রফেশনাল পরীক্ষা হতো৷ পরীক্ষা আগমনের ভীতি কাটাতে এক নম্বর হোস্টেল থেকে কৃষ্ণচুড়ার ডগার দিকে তাকিয়ে থাকতাম৷
লাইটিং এ পুকুর মসজিদ, হাসপাতাল হোস্টেলের, গাছপালাগুলোর শ্রী বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে৷ দেখে দেখে মুগ্ধ হই আর ভাবি ” এই প্রিয় বিদ্যাপীঠে কি এভাবে কখনো আসা হবে?”
কোন জবাব আসে না৷

আমরা মানুষেরা এতো বিচিত্র কেন ভেবে পাওয়া মুশকিল৷
কনফ্লিক্ট নিয়ে চলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি আমরা৷
অসম্ভবকে আমরা সম্ভব করার চেষ্টায় থাকি ব্যাকুল৷ তাই কষ্ট বাড়ে৷
আমাদের বত্রিশ, কারও আরও বেশি বছর এই ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নেয়ার পর অনেকেই প্রথম এখানে পা রাখলেন৷ আমি খেয়াল করলাম সবাই বাহ্যিকভাবে আনন্দ করছে, হাসছে খেলছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে কি যেন খুঁজে ফিরছে৷
বসন্তের বাতাসে তাল গাছের ডগায় থেমে থেমে ছন্দে ছন্দে যে একপ্রকার শব্দ সৃষ্টি করে প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের মনে তেমন বেদনার মিউজিক বেজে যাচ্ছে৷

হারানো দিন কেউ কোনদিন খুঁজে পায় না, এখানেও কেউ পাননি৷ শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরাও সেই দিনগুলো খুঁজে না পাবার মনোবদনা নিয়েই ফিরে যাবে৷ হ্যা, বন্ধুদের সান্নিধ্য, তাদের ভালবাসায় সিক্ত হবার সুযোগটুকুই সম্বল৷
সুখময় সময় একেই বলে- অতীত খুঁজে না পাবার বেদনাও মুখে হাসি নিয়ে আসতে পারে, তদ্রুপ বন্ধুদের বুকের সুখের ঘ্রানও কান্নার জল ফেলাতে পারে৷

প্রতিটা মানুষ নিজেকে ভালোবাসে, তাই তার ব্যাচকে সে শ্রেষ্ঠ ভাবে৷
মূলত:ই তাই৷
শেবাচিমের সবাই শ্রেষ্ঠ৷ এখানে বাংলা ব্যাকরণ থেমে গেছে৷ যারা ব্যক্তিগত সকল কর্ম ফেলে রেখে, স্ত্রী-পুত্র পরিজনকে দূরে রেখে তিনদিন বন্ধুত্বের স্বার্থে একত্রে কাটাতে পারে তারা আসলেই শ্রেষ্ঠ৷
যে চিকিৎসক এমন উৎসবের আহবানে তিনদিন চারদিন ব্যক্তিগত প্রাকটিস বন্ধ রাখতে পারে তারাই শ্রেষ্ঠ৷

অনেক পেয়েছি৷ মিলনমেলার এই উৎসবে ছোট বড় সবাই আনন্দে আত্মহারা!
কি পাইনি আমরা? বড়দের খাদহীন স্নেহ, ছোটদের অকৃত্তিম শ্রদ্ধা, মাঝবয়সীদের তাজা ফ্রেস ভালোবাসা সবই আমরা পেয়েছি৷
মন কি তৃপ্ত হলো?
খুব কঠিন প্রশ্ন৷

না, মনকে তৃপ্ত করা কঠিন৷
যা খুঁজে পাইনি তার জন্য মন খারাপ করেছি৷

প্রশ্ন জাগছে “কেন সব খুঁজে পাওয়া যায় না, কোথায় আটকে আছে সবকিছু?”

যা অতীত হয়ে গেছে তাকে বেশি ঘাটতে হয় না৷ মিলেছি, খেলেছি, হেসেছি, ভেসেছি, দেখেছি -ব্যস৷ বন্ধুরা গল্প করেছি, স্মৃতিচারণ করেছি৷ হৃদয়ে হৃদয় মিলিয়েছি ঠিক আগেরই মতন৷
আমরা হ্যাপি৷

লেখক : প্রফেসর ডা. মেজর (অব.) আব্দুল ওহাব মিনার
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
শেবাচিম ১১তম ব্যাচ ৷

Related posts

Leave a Comment