বঙ্গবন্ধুতে বৈকালিক সেবায় ভোগান্তি

বিএসএমএমইউ’তে স্বল্প খরচে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ (বৈকালিক সেবা) পেতে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হচ্ছে রোগীদের। নির্ধারিত সংখ্যক টিকিটের বিপরীতে রোগী বেশি হওয়ায় বিনা চিকিৎসায় ফিরে যেতে হচ্ছে অনেককে। তাই টিকিট সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য মেডিকেলগুলোতেও এ ধরনের সেবা চালু করার কথা বলছেন ভুক্তভোগীরা।

গত কয়েক মাস রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) সরেজমিন ঘুরে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে বৈকালিক সেবা নিতে যাওয়া রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় অল্প সংখ্যক টিকিট (প্রতি বিভাগে ২০টা) দেয়ায় দীঘর্ক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় ৭০ ভাগ রোগী।

গত সোম ও মঙ্গলবার চিকিৎসা কেন্দ্রটির ১ ও ২নং বিহবির্ভাগ ঘুরে দেখা যায়, দুপুর আড়াইটা থেকে বৈকালিক চিকিৎসাসেবার টিকিট বিতরণ শুরু হলেও সকাল ১০টায় রোগীর দীঘর্ সারি। দুই ইউনিটের ৬টা লাইনে দেড় হাজারের অধিক মানুষ চিকিৎসা নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। সেখানে প্রতি বিভাগে কয়টি টিকিট দেয়া হয় এমন প্রশ্নের জবাবে কাউন্টার থেকে জানানো হয়, ডাক্তাররা এসে নিধার্রণ করে কতজন রোগী দেখবেন। তবে ২০০ টাকার বিনিময়ে নারী-পুরুষসহ ১৫ থেকে ২০টা করে টিকিট দেয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিটি বিভাগে প্রতিদিন ৫ জনের মতো ফলোআপে আসা রোগী দেখেন। কাউন্টারের পাশেই মাইক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ফয়সাল ও মাহবুব নামে দুইজন নিরাপত্তা কমীর্ জানান, সকাল ৬টা থেকে লাইন শুরু হয়। অনেক সময় সিরিয়াল ভঙ্গ নিয়ে রোগীদের মধ্যে ঝগড়াও হয়। আর প্রতি বিভাগে একজন করে অধ্যাপক বা সহকারী, সহযোগী অধ্যাপক রোগী দেখেন। সঙ্গে অন্য চিকিৎসককে রাখা না রাখাটা ডাক্তারের উপর নির্ভর করে।

হাসপাতাল সমাজসেবা বিভাগে ইন্টার্ন শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান বলেন, এখানে বৈকালিক সাভিের্সর অন্যান্য বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা ভালোমতো পাওয়া গেলেও মেডিসিন, হেমাটোলজি, পেডিয়াট্রিক, নিউরোলজি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে অনেকেই টিকিট না পেয়ে ফিরে যান। টিকিটের জন্য অপেক্ষারত শাহাদত নামে ঢাকা কলেজের এক শিক্ষাথীর্ বলেন, এখানে টিকিট পাওয়া অনেকটা সোনার হরিণের মতো। তিনি অভিযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ৫৪টি বিভাগের উল্লেখ আছে। কিন্তু বৈকালিক সেবা দেয়া হয় মাত্র ২৪টিতে। সবমিলে প্রায় ৬০০ জনের মতো রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হলেও প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজারের মতো রোগী আসেন।

নরসিংদী জেলার বাবুরহাট থেকে বৃদ্ধা মাকে মেডিসিনের চিকিৎসক দেখাতে আসা জায়েদা খাতুন বলেন, গত সপ্তাহে সকাল ১০টায় লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ায় ফিরে যেতে হয়েছে। ঢাকায় থাকার মতো আত্মীয়ও নেই। তাই বিশেষজ্ঞ সেবা পাওয়ার আশায় খুব ভোরে মাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু এতদূর থেকে এসেও ডাক্তার সবমিলে দুই মিনিট সময় দেখেছেন কিনা সন্দেহ। শুধু ২টা টেস্ট ও গ্যাসের ওষুধ লিখে দিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আসতে বলেছেন।

বহিবির্ভাগের বেজমেন্ট পযর্ন্ত দীঘর্ লাইনে অপেক্ষারত শনির আখড়া থেকে আসা নাসিমা বেগম বলেন, শনিবার সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েও মেডিসিন বিভাগের টিকিট পাননি। তাই ফজরের নামাজ শেষ করেই এখানে চলে এসেছেন। বিষয়টি সম্পকের্ নাম না প্রকাশ করার শতের্ বৈকালিক সাভিের্স চিকিৎসারত কয়েকজন ডাক্তার বলেন, দেশের আথর্-সামাজিক নিদের্শকসমূহের মধ্যে স্বাস্থ্য সামাজিকসেবা জরিপ-২০১৬ অনুযায়ী ২ হাজার ৩৯ জন জনসংখ্যার বিপরীতে ১ জন করে চিকিৎসক আছেন। ফলে রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক কম, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও কম। তাই প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠীকে স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে ২০১১ সালের অক্টোবর থেকে বিএসএমএমইউতে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা চালু করা হয়। তবে শুরুর পর থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় টিকিট সংখ্যা বাড়েনি। ফলে অনেকে দীঘর্ যানজট ঠেলে দূর থেকে এসেও কাক্সিক্ষত সেবা নিতে পারছেন না অনেকেই।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, বতর্মানে বিএসএমএমইউ’র বৈকালিক সেবা ইউনিটে ক্যান্সার, পেলিয়াটিভ কেয়ারসহ ২৪টি বিভাগে বিভিন্ন দূরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞরা সেবা দিচ্ছেন। মানসম্মত চিকিৎসার নিশ্চয়তা পাওয়ায় রোগীর সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। টিকিট ও চিকিৎসক সংকটের ব্যাপারে অভিযোগ তারাও শুনেছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও টিকিট সংখ্যা বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

সৌজন্যে : যায়যায়দিন।

Related posts

Leave a Comment