জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ভ্যাকসিন সংকট, হুমকিতে নারী স্বাস্থ্য

দীঘির্দন ধরে সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে দেশে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধী ভ্যাকসিনেরও সংকট দেখা দেয়ায় সেবাপ্রত্যাশী নারীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। গুরুত্বপূণর্ এই ভ্যাকসিনের অভাবে ভবিষ্যতে নারী স্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এমন আশঙ্কা করছেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারাবিশ্বে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের দ্বিতীয় প্রধান ক্যান্সার হচ্ছে জরায়ুমুখ ক্যান্সার। এমনকি দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৮ জন নারী এই ক্যান্সার আক্রান্তের কারণে মারা যায়। তবে এটি রোধের পূবর্ প্রস্তুতি হিসেবে ২০০৭ সালে প্রতিষেধক (ভ্যাকসিন) ব্যবহার শুরু হয় অস্ট্রেলিয়ায়। পরে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (ইউএসএফডিএ) অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশেও এটির বাজারজাত শুরু হয়।

আর এ ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্লাস্কোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) তৈরি স্যাভারিক্স (০.৫ এমএল) ও হেলথ কেয়ার ফামাির্সউটিক্যাল লিমিটেড কতৃর্ক আমদানিকৃত গাডাির্সল (০.৫ এমএল) নামে দুইটি ভ্যাকসিন দেশে বাজারজাত করে আসছিল। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে গাডাির্সল এবং দুই মাস ধরে স্যাভারিক্স ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন নারীরা।

এদিকে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ভয়াবহতা ও এর প্রতিরোধক ভ্যাকসিনের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, সারাবিশ্বে নারীদের ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর কারণ হিসাবে জরায়ু ক্যান্সারের অবস্থান চতুর্থ। জরায়ুমুখ ক্যান্সারের কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসকে (এইচপিভি)। গবেষণায়ও দেখা গেছে প্রতিটা মেয়ের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) জনিত ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা সারা জীবনে প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে ভ্যাকসিন নেয়ার মাধ্যমে মরণঘাতী এই ক্যান্সার (সার্ভিক্যাল ক্যান্সার) প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করা যায়।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশীয় উৎপাদন ও বাইরে থেকে আমদানি না থাকায় বর্তমানে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভ্যাকসিন সেন্টার সন্ধানীর স্বাস্থ্যকর্মী আজবুল ইসলাম ও মিতুল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকা সেন্টারে কর্মরত সম্পা দাস ছাড়াও বেশ কয়েকটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগ, মেডিকেল প্রতিনিধি ও ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতাল, ল্যাব এইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং এসব সেন্টারে টিকা নিতে আসা একাধিক নারীর সঙ্গে কথা বলেও ভ্যাকসিন না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত বুধবার বিএসএমএমইউতে ভ্যাকসিন নিতে মোহাম্মাদপুর থেকে আসা সিএ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা জাহানারা খানম ও বংশাল থেকে আসা গৃহিণী জ্যোতি আলমসহ ৫ জন নারীকে ফিরে যেতে দেখা যায়। জাহানারা অভিযোগ করেন গত ২৪ এপ্রিল ও ২৪ মে দুইটি ভ্যাকিসন নিয়েছেন। ২৪ অক্টোবর ৩ নম্বর ডোজ নেয়ার শেষদিন ছিল। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় ফিরে যাচ্ছেন। সাবিহা আশা ও নাজমুন্নাহার নামে দুই নারী জানান, ভ্যাকসিন না থাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে ঢামেক, ইবনে সিনা ও ল্যাব এইডসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে কোথাও টিকা (ভ্যাকসিন) পাননি তারা।

বিষয়টি সম্পকের্ জানতে চাইলে নাম না প্রকাশ করার শতের্ বিএসএমএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের একজন অধ্যাপক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাকসিন সেন্টারে মোট ২০ ধরনের টিকা দেয়া হয়। এর মধ্যে প্রতিমাসে গড়ে ৬০ জন নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধের টিকা নিতেন। কিন্তু বতর্মানে সরবরাহ বন্ধ থাকায় ফিরে যেতে হচ্ছে সবাইকে। কারণ গত দুইমাস হল জিএসকে ভ্যাকসিন দিচ্ছে না। সর্বশেষ চলতি অক্টোবর চিঠি দিয়ে সরবরহ না করার বিষয়টি নিশ্চিত করে। তাদের অভিযোগ মূলত ওষুধ ব্যবসার ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ না পাওয়ায় ও বাজারজাত করতে নানা ঝামেলার শিকার হওয়ায় ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন তারা (জিএসকে)।

ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকার ব্যাপারে হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ রেগুলারিটি অ্যাফেয়াসর্ তারিক মাহমুদ বলেন, বিশ্ববাজারে এই ভ্যাকসিনের সরবারহ কম থাকায় তারা চাইলেও আমদানি করতে পারছেন না।

বিষয়টি সম্পকের্ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক রুহুল আমিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভ্যাকসিন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হেলথ কেয়ার লিমিটেড ছাড়াও আন্তর্জাতিক ওষুধ প্রতিষ্ঠান সনোফিকে ভ্যাকসিন আমদানি করতে বলা হয়েছে। তারা ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে অধিদপ্তর থেকে একটি চিঠি ইস্যু করতে বলেছেন যেটা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠাবে। এই ভ্যাকসিনটি জরুরি বলে অন্যান্য ওষুধ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকেও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হবে।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা

ক্যান্সার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন মূলত হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের ১৬ ও ১৮ নাম্বার স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে এই ভ্যাকসিন বানানো হয়েছে। শূন্য, এক ও ছয় মাস হচ্ছে এই ভ্যাকসিনের ডোজ শিডিউল। অর্থাৎ প্রথম ডোজ দেয়ার একমাস পর দ্বিতীয় ডোজ এবং প্রথম ডোজের ৬ মাস পরে তৃতীয় ডোজ দিতে হবে। ৩ ডোজের এই ভ্যাকসিন দেয়ার আদশর্ সময়কাল হচ্ছে ১১ থেকে ১২ বছর বয়স। বিবাহিতরা ভ্যাকসিন দিতে চাইলে প্যাপ স্মেয়ার নামক টেস্ট করে এইচপিভি ইনফেকশন আছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। এক ডোজ স্যাভারিক্স ভ্যাকসিনের দাম দুই হাজার এবং গাডাির্সলের দাম ৪ হাজার ২৫৪ টাকা।

Related posts

Leave a Comment