কাকে শিক্ষা দিতে আপনি আত্মহত্যা করবেন?

ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী :

আমরা চিকিৎসকরা রাত দিন রোগ-শোক, দুঃখ-বেদনা,জরাগ্রস্থতাকে খুব কাছ থেকে দেখি। জন্মের মত উৎসবমুখর ঘটনা আর মৃত্যুর মত হৃদয় ভাঙ্গা দৃশ্য একি সাথে চোখের সামনে ঘটতে দেখে অনুভূতিগুলো খানিকটা হলেও ভোঁতা হয়ে যায়।

এই ভোঁতা অনুভূতি নিয়েই একটি দৃশ্য বড় করুন লাগে।কোন অসহায় নিষ্পাপ শিশু সন্তানের সামনে থেকে কোন অভিমানী মা যখন আত্মহত্যা করে অকালে বিনা নোটিশে পৃথিবী থেকে চলে যায়।

হাসপাতালের মলিন বারান্দায় নগ্ন পায়ে, উষ্ক চুলের, উদভ্রান্ত শিশুটি যখন মা মা মা বলে চিৎকার করে কাঁদছে। আপনি তখন ঐ সন্তানের লালন পালনের কঠোর পথ পাড়ি দেবার যন্ত্রনা সইতে না পেরেই হয়ত মুখে পুড়েছেন ঘুমের বড়ি। শুয়ে আছেন ঐ হাসপাতালেরই মর্গে।শুনছেন না আপনার প্রানপাখির ডাক।
হেরে গেছেন আপনি আপনার জীবনযুদ্ধে। আর সেই সাথে জীবনযুদ্ধ শুরু করবার আগেই হারিয়ে দিয়েছেন আপনার প্রিয় সন্তানকে।

চিরতরে তাকে করে তুললেন মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। ছোট্ট বুকে জমা হওয়া পাথর ভারী প্রশ্ন “মা কেন এভাবে চলে গেল” এর উত্তর দিতে আপনি আর কখন ও আসবেন না।

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে, ব্যস্ততার এই যুগে,অসহিষ্ণুতার এই যুগে, দায়িত্বহীন এবং স্নেহহীনতার এই যুগে কর্মজীবী মেয়েদের ক্ষেত্র সবথেকে অসহায়ত্ব নেমে আসে তাদের সন্তান ধারন, বহন এবং লালন পালনের ক্ষেত্রে।

মাত্র কিছু বছর পূর্বেও সমাজে প্রবীনদের অবসর কাটাবার হেতু ছিল না। দাদা দাদী,নানা নানী কিংবা সমাজের প্রবীনরা একটা নতুন শিশুর মুখ দেখতে উদগ্রীব হয়ে থাকত। পরিবারের নতুন সদস্যটির লালন পালন তখন মার একার দায়িত্ব ছিল না। হেল্পিং হ্যান্ড এভেইলেভল ছিল।গার্মেন্টস শিল্পের উন্নতির ফলে সে সুযোগ ও এখন নাই।

পরিবারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কর্মজীবী উচ্চশিক্ষিত মেয়েরা তাই মা হতে গিয়ে হয়ে পড়ছেন বিপদগ্রস্থ।
তার সাথে সন্তান যদি একটু ডিমান্ডিং হয় তথা স্পেশাল কেয়ার নিডেড – তাহলে জীবন হয়ে যায় নরক।
আপনার হাজার অভিযোগ। আপনার অফিস, ডিগ্রী, প্রমোশন, ক্যারিয়ার একদিকে। আর একদিকে সন্তান। যে পরিবারকে অনেক ভালোবাসেন। ছাত্র জীবনে চাকুরী করে যে বাবাকে অর্থনৈতিক সাপোর্ট দিয়েছেন, ভাই বোনকে পড়িয়েছেন, যে মায়ের চিকিৎসা করিয়েছেন এমনকি যে প্রেমিকের পড়া খরচ চালিয়েছেন সেই সন্তানের বাবা ও পাশে নেই সন্তান পালনে।

সেই অভিমানে আপনি আত্মহত্যার কথা ভাবছেন। আপনার ভাবনার তীব্রতা বাড়ছে। মানব মন বড় বিচিত্র। আপনি নিজের মনকে ভুল সমাধানের পথ দেখিয়ে নিজেই নিজেকে সর্বনাশের শেষ প্রান্তে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন নিজের অজান্তে।
ভাবনাটাকে বদলে দিন। যেই মা সন্তান কোলে ইট ভাঙ্গছেন – তার কথা ভাবুন। চাকরী ছাড়বেন না। কিন্তু ক্যারিয়ারটাকে পজ দিন।

আপনার পরিবারের সদস্যরা যত বেশী দায়িত্বহীন, আপনার স্বামী যত বেশী সন্তানের প্রতি উদাসীন – ওর জীবনে আপনার প্রয়োজনীয়তা তত বেশী।
কাকে শিক্ষা দিতে আপনি আত্মহত্যা করবেন?

মাঝ রাতে গাজার আড্ডাতে ফূর্তি করা ভাই – বোন বা দেবর – ননদ আপনার বাচ্চার কান্না শুনে আপনাকে অযোগ্য মা বলবে। তাতে আপনার মাতৃত্ব কমে যাবে?
ইগনোর দেম।
বি কনফিডেন্ট।
আপনার মাতৃত্বের ব্যাপারে জাজমেন্টাল হওয়া ননসেন্সগুলোকে কিক আউট করুন। নিজেকে কেবল সন্তানের লালন পালনে উপযোগী করুন। এটা কেবল চার পাঁচ বছরের ব্যাপার।

পরে এই সন্তান আর অসহায় থাকবে না।
কিন্তু আত্মহত্যা কোন সমাধান না। আপনি বিহীন আপনার শিশুর জীবনটাকে চোখ বন্ধ করে ভাবুন। কারো জীবনে আনন্দের ভাটা পরবে না। কেবল মাতৃহীন হলে ওর কচি মুখে খুশির হাসি আর কখনোই আসবে না।

তাই সন্তান পালনে অস্থির মা গন, অধিকার নেই আপনার সন্তানকে আরো বেশী বিপদগ্রস্থ করে নিজেকে স্বস্তি দেয়ার। বরং সন্তানকে সাথে নিয়ে লালন পালনের যুদ্ধটাই জরুরী।

মনে রাখবেন, আপনাকে বাঁচতে হবে, জিততে হবে।
তবেই জয় হবে মাতৃত্বের। জয় হবে আপনার সোনামানিকের!

Related posts

Leave a Comment