শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের প্রজেক্ট পরিচালকের একান্ত কথা

অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম :

আমরা এখন গর্বের সাথে বলতে পারি যে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের অধিকারী আমরা। কিন্তু অবাক করার মত ব্যাপার হলো এই সুবিশাল অর্জনের জন্য আমাদের খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। বাংলাদেশে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি সাবজেক্টটির সঠিকভাবে চর্চা শুরু হয় স্বাধীনতারও অনেক বছর পরে। এটি মেডিকেল সায়েন্সের অপেক্ষাকৃত নতুন একটি ডিসিপ্লিন এবং সুপার স্পেশালাইজড একটি বিষয় হবার কারণে এটিকে নিয়ে কাজ করার জন্য যে অবকাঠামোর প্রয়োজন তা আমাদের ছিলনা। এখানেই আমাদের দেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম বড় বিজয়গাঁথা নিহিত যেখানে আমরা একদম শূন্য থেকে শুরু করে মাত্র সাড়ে তিন দশকের মধ্যেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধুনিক বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট তৈরি করতে পেরেছি।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বার্ন ইউনিট তৈরি হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৯৭৯ সালে, মাত্র পাঁচটি বেড নিয়ে। ১৯৮৯ সালে আমি যখন সার্জন হিসেবে ক্যাজুয়ালটি বিভাগে যোগদান করি, তখনো ইউনিটের অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তখনো এই ডিসিপ্লিনের কোন ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশের কোথাও ছিলনা, কোন প্রফেসর বা মেডিকেল অফিসারও না। হয়তোবা সম্পূর্ণ নতুন ও সম্ভাবনাময় বিষয় বলেই আমার প্লাস্টিক সার্জারির প্রতি আগ্রহ জন্মায়। বার্ন ইউনিটে যে শুধুমাত্র দুর্ঘটনায় আগুনে পুড়ে যাওয়া রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয় তা নয়। যেকোনো দুর্ঘটনার ও ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের টিস্যু রিকনস্ট্রাকশন আমরা করে থাকি। এরকম প্রচুর রোগী দেশে থাকলেও সঠিক অবকাঠামো ও জনবলের অভাবে আমরা সঠিক চিকিৎসা দিতে পারছিলাম না। আমার ট্রেনিং শুরুর কয়েক দিন পরেই তৎকালীন পঙ্গু হাসপাতালে ছোট পরিসরে একটি প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট চালু করা হয় ও আমি সেখানে সিএ হিসেবে যোগদান করি। আগামী দশ বছরে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয় যাতে আমি ও আমার সহকর্মীরা সর্বাত্মক সহায়তার চেষ্টা করেছি। ২০০০ সালের পরে আমরা অনেকদূর এগিয়ে যাই যখন প্লাস্টিক সার্জারিতে পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশন কোর্স চালু হয় ও আমরা এই বিষয়ের জন্য একটি পরিপূর্ণ ও যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়নে সক্ষম হই। ওই সময় সারা দেশে প্লাস্টিক সার্জন ছিলেন ৭ জন, এখন আছে ৯০ জন মত। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি কারণ এরা সবাই আমার নিজের ছাত্র ছাত্রী, প্রায় সবাইকেই আমি নিজে হাতে কাজ শিখিয়েছি।

২০০৯ সালে আমি ফুল প্রফেসর হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ডিপার্টমেন্টের প্রধান হিসেবে যোগ দেই। তখন এখানেই ইনস্টিটিউটের কাজকর্ম অস্থায়ীভাবে শুরু হয়। এক্ষেত্রে আমরা কতদূর এগিয়েছি তা বোঝার জন্য বলতে হয় যে আমার প্রফেসর হিসেবে যোগদানের সময় ঢাকা মেডিকেলে প্লাস্টিক সার্জারি হত বছরে ১০০টি মত। সেখানে গত শুধু বছরেই আমরা সার্জারি করেছি ৮৫ হাজারের মত। এ বছরেই আমরা পেয়েছি শেখ হাসিনা ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের মত একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও রিসার্চ সেন্টার।

জাতি হিসেবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের একদম শুন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে। কিন্তু তাতে আমাদের অগ্রগতি থেমে থাকেনি। এমন একদিন হয়তো আসবে যেদিন প্লাস্টিক সার্জারিতে বাংলাদেশের সার্জনরা পৃথিবীসেরা হবে, এই বিষয়ে রিসার্চে আমরা থাকবো সবচেয়ে এগিয়ে। আমরা আবারো প্রমাণ করে দেব যে চেষ্টা করলে আমরা সব পারি।

লেখক : DMC K-35
Professor of Plastic Surgery, Dhaka Medical College Hospital
Project Director, Sheikh Hasina National Institute of Burn and Plastic Surgery

Related posts

Leave a Comment