ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও বাস্তবতা

ডা. মিথিলা ফেরদৌস :

ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কমন অভিযোগ
১. ডাক্তারদের ব্যবহার খারাপ।
২. ডাক্তার সময় দেন না।
৩. কম ঔষধ দেন বা বেশি ঔষধ দেন।
৪. কম টেস্ট দেন বা বেশি টেস্ট দেন।
যাইহোক অভিযোগের শেষ নাই। অভিযোগ ভিত্তিহীন না। আবার ডাক্তারদের স্বপক্ষেও কিছু যুক্তি আছে।

আমার এক আত্মীয়াকে আমার পছন্দের একজন কার্ডিওলোজিস্টের কাছে নিয়ে গেলাম। যেহেতু আমি ওখানকার মেডিকেলেই পড়তাম, কোন স্যার কেমন আমি জানতাম। আত্মীয়া স্যারের রুমে গিয়েই বিরক্ত। তারমধ্যে স্যার বেশি কথাও বললেন না, শুনলেন না, নিজে কিছু পরিক্ষা করে, টেস্ট দিলেন না, তিনটা ঔষধ দিয়ে ছেড়ে দিলেন। আত্মীয়া চেম্বার থেকে বের হয়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, তিনি উনার চিকিৎসা নিবেন না। ব্যবহার ভাল না, চেম্বার তেমন হাইফাই না, তারমধ্যেই তিনি খেয়াল করেছেন, স্যারের চেয়ারের নীচে চট পাতানো। যাইহোক আত্মীয়াকে আবার আরেক স্যারের কাছে নিতে হলো, যার ব্যবহার অতিরিক্ত মিষ্টি, তিনি একগাদা টেস্ট ধরায় দিলেন, সাথে একগাদা ঔষধ প্রেসক্রাইব করলেন। আমার রিলেটিভ এতেও বিরক্ত। আমি হাপায় উঠলাম। এরপর উনি ঢাকায় একজন নামকরা ডাক্তার দেখালেন, রুগীর সাথে ভাল ব্যবহার করেন, এবং ভাল চিকিৎসাও দেন। যাইহোক তার চিকিৎসায় নাকি সুস্থ ছিলেন, তার ফলো আপেই থাকতেন।

প্রথম কার্ডিওলোজিস্ট স্যারকে আমি নিজের বাবা মা কেই দেখাতাম, স্যার হজ্জ্ব করা, মেয়েদের দিকে তাকাতেন না। আমি আম্মার হিস্ট্রি সংক্ষেপে বলার পর, উনি টুকটাক প্রশ্ন করলেন, কিছু নিজে পরিক্ষা করলেন, এবং দুইটা ঔষধ দিয়ে ছেড়ে দিলেন। আমিই অনুরোধ করলাম, একটা ইসিজি করে দিতে। করে দিলেন, নরমাল আসলো। আব্বার ক্ষেত্রে একই ঘটনা। স্যার যতদিন রংপুরে ছিলেন, আমি আব্বা আম্মাকে স্যারের ফলো আপেই রাখতাম।

রংপুরের দুইজন বিখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ স্যারের চিকিৎসা আমার ছেলে পেয়ে আসছে। দুইজন স্যারই আমার কাছে প্রিয়। একজন খুব কম কথা বলেন এবং শুনেন, কম ঔষধ দেন খুবই ইথিকেল প্রাক্টিস করতেন। আমি স্যারের ইন্টার্নি ছিলাম, আমি দেখেছি ফাইলে বাড়তি ঔষধ থাকলে ফাইল ছুড়ে ফেলে দিতেন। আরেকজন স্যার আমি রংপুর থেকে চলে আসার পর এসেছেন, উনার ব্যবহারে যে কেউ মুগ্ধ। বাচ্চা খুশি, বাচ্চার বাবা মা খুশি। আমিও যতবার স্যারের কাছে গেছি, মুগ্ধ হয়েছি। স্যার সারারাত রুগী দেখে কুলাতে পারতেন না। দুইজন স্যারের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ।

এখানে কিছু উদাহরণ দিয়ে সব ধরনের ডাক্তার সম্পর্কেই কিছু বুঝানোর চেষ্টা করেছি মাত্র। ডাক্তারের ব্যবহার খারাপ হলেই সেই ডাক্তার খারাপ, খুব ভুল একটা ধারনা। অনেকেই অভিনয় করতে জানেননা, তারা স্পষ্টভাষী। তারমানে এই নয় যে উনি ডাক্তার খারাপ। একজন প্রফেসর হাসপাতাল আর চেম্বার মিলে দিনে অসংখ্য রুগী দেখেন। তার অভিজ্ঞতা এত বেশি যে, অল্প কথা শুনেই বোঝেন তার সমস্যা কি? তাই রুগীর সাথে অনেকেই বেশি কথা বলেন না। আমি অনেককেই এমন দেখেছি, যাদের বেশি ধান্দা থাকে তারাই বরং মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে রুগীকে নিজে কত বড় ডাক্তার বোঝানোর চেষ্টা করেন, গাদা গাদা টেস্ট, গাদা গাদা ঔষধ ধরায় দেন। তবে এইসব প্রাক্টিস করে ফার্মেসী আলারা, কোয়াকরা বেশি (যাদের সাধারণ মানুষ ডাক্তার হিসেবেই জানে)। যাদের দরকার রুগীর ব্রেন ওয়াস করা।

এখন আসি, যারা সব্যসাচী ডাক্তার তাদের ব্যাপারে। এনারা ডাক্তার হিসেবে অসাধারণ, সন্দেহ নাই। এনারা মিষ্টভাষী, ডাক্তার হিসেবেও তুলনাহীন, সব রুগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেন, রুগীকে বুঝায় দেন, ভাল চিকিৎসাও দেন। ইনাদের কেউ কেউ নির্দিষ্ট সংখ্যক রুগী দেখেন, আবার কেউ কেউ দিনরাত এক করে রুগী দেখেন। ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছুই থাকেনা উনাদের। মানবসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে দেন। নিঃসন্দেহে উনারা অতুলনীয় রুগীদের কাছে, ব্যক্তিগত জীবনে যেমনই হোক।

আমি ব্যক্তিগতভাবে কম ঔষধ দেয়া ডাক্তার পছন্দ করি, তারমানে এই নয় যে বেশি ঔষধ দিলেই খারাপ ডাক্তার, চিকিৎসার প্রয়োজনেই বেশি ঔষধ দিতে হতেই পারে। আমি কম টেস্ট দেয়া পছন্দ করি। তার মানে এই না যে, বেশি টেস্ট দিলে ডাক্তার খারাপ। প্রয়োজনেই বেশি টেস্ট দিতে হয়। অনেক সময় ডিজিস সঠিকভাবে নির্ধারনের জন্যে টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ। যার উপর নির্ভর করে ভাল চিকিৎসা। কম সিরিয়ালের ভাল ডাক্তারের আমার পছন্দ, তারমানে এই না বেশি সিরিয়ালের ডাক্তার খারাপ। বেশি সিরিয়াল মানেও অবশ্যই ভাল ডাক্তার।

দুনিয়াই চলছে রিলেটিভ গতিতে, আপনি তাই এবসলিউট কিছুই কারো কাছেই আশা করতে পারেন না। সবারই নিজের স্বপক্ষে যুক্তি আছে। যে অভিজ্ঞ ডাক্তার কম কথা বলেন বা শুনেন, তিনি ভান করতে পারেন না, অভিনয় করতে পারেন না, স্পষ্টভাষী তারমানে এই নয়, যে তিনি ভাল ডাক্তার নন। আবার যে ডাক্তার চিন্তা করেন, একজন রুগী অনেক কষ্ট নিয়েই একজন ডাক্তারের কাছে আসেন, তার কষ্ট গুলি বলেও তার রোগের কিছুটা কষ্ট দূর হয়, কাজেই তার কথা মনোযোগ দিয়েই শোনা উচিৎ, তাকে বুঝানো উচিৎ। নিঃসন্দেহে তিনিও ভাল ডাক্তার। তার রুগী বেশি, তার সিরিয়াল বেশি, তার কাছে দেখানও বেশি কষ্টকর।

এখন পছন্দ আপনার কাছে, আপনি কেমন ডাক্তার চান? ডাক্তার সম্পর্কে জেনে নিয়ে তাকেই দেখান, তবুও ডাক্তারদের ব্লেম দিবেন না। মনে রাখবেন, সব মানুষের নিজের স্বপক্ষে যুক্তি আছে। ডাক্তার আপনাকে ডেকে নিয়ে যেহেতু যায় না, আপনিই বেছে নিন আপনার ডাক্তারকে।

©মিথিলা ফেরদৌস

Related posts

Leave a Comment