বিদেশী ডাক্তারও ধর্মঘট করেন!

ডা. জয়নাল আবেদীন :

মানুষ মনের সুখে ডাক্তারের মুখ দর্শন করতে চায় না। মোটামুটি চরম একটা মানসিক এবং শারীরিক বিপর্যয় নিয়েই মানুষ ডাক্তারের কাছে আসে। মানুষের এমন মানবিক পরিস্থিতিতে ডাক্তারদের কর্মবিরতি পালন কতটা যৌক্তিক সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার প্রতিনিয়ত পীঠের মধ্যে কিল ঘুষি, হুমকি- হামলার মধ্যে কাজ করাটা ডাক্তার থেকেও কতটা প্রত্যাশিত সেটাও একটা প্রশ্ন। যাই হোক, আলোচনা না; কিছু তথ্য দেয়ার জন্যই এই লেখা।

আমাদের মিডিয়া, বেশি বিশিষ্ট, কম বিশিষ্ট, মাঝারি বিশিষ্ট অনেকের কাছে থেকে প্রায়ই শুনি বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে ডাক্তাররা মানুষের জীবনকে জিম্মি করে কর্মবিরতি ডাকে। ভারতের কোনো ডাক্তার সচক্ষ্যে না দেখা অনেকেও এক্ষেত্রে ভারতের ডাক্তারদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কৌতূহলবশত একটু ঘাটাঘাটি করে যা পেলাম সেটা আঁতকে উঠার মতোই।

ভারতের ডাক্তাররাও এদেশের বদ ডাক্তারদের মতো কর্মবিরতি পালন করেন। সেটাও একবার না, মোটামুটি লিস্ট করে বলার মতোই। আচ্ছা লিস্টটা দিয়েই দিই।

(১) ২২ মে, ২০১৮ঃ
মহারাষ্ট্রের জেজে হাসপাতালে রোগী মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দুই ডাক্তারের উপর হামলা করা হয়। প্রতিবাদে এই রাজ্যের ৪০০ জন ডাক্তার সরাসরি কর্মবিরতিতে চলে যান। ৪ দিন পর রাজ্য সরকার তিন মাসের মধ্যে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ( হাসপাতালে ১২৮ জন গার্ড নিয়োগ) দেয়ার অঙ্গীকার করার পর এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করলে কর্মবিরতি স্থগিত করেন ডাক্তাররা।

(২) ২৭ এপ্রিল, ২০১৮ঃ
একজন সিনিয়র ডাক্তার কর্তৃক রোগীদের সামনেই একজন আবাসিক ডাক্তারকে চড় মারার প্রতিবাদে অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল সার্ভিস এর সকল ডাক্তার একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতিতে চলে যান। সকল ধরণের অপারেশন বন্ধ করা হয়, হাসপাতালে নেয়া বন্ধ করা সব নতুন রোগী। সকল ক্লিনিক ধরাবাধার মধ্যে চলে আসে। সব একাডেমিক ক্লাস এবং পরীক্ষা অনিরদিস্থকালের জন্য বন্ধ করা হয়।

(৩) ১ এপ্রিল, ২০১৮ঃ
আয়ুর্বেদিক ডাক্তাররা প্রেসক্রিপশন লিখতে পারবে, এমন আইনের প্রতিবাদে ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রায় তিন লাখ ডাক্তার দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন।

(৪) ১ জানুয়ারি, ২০১৮ঃ
ন্যাশনাল মেডিকেল বিলে হোমিওপ্যাথী এবং আয়ুর্বেদিক ডাক্তারদেরকে প্র্যাকটিস করার অনুমতি দানের প্রতিবাদে ইন্ডিয়ান মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন ১২ ঘণ্টার “বন্ধ” এর ডাক দেয়। এখানেই শেষ না, ডাক্তাররা পরের দিনকে তাদের ইতিহাসের “ব্ল্যাক ডে” হিসেবে পালন করেন।

(৫) ৩ নভেম্ভর, ২০১৭ঃ
ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসা কিংবা ম্যালপ্র্যাকটিস বন্ধে শাস্তি জারি করে কার্ণাটাক রাজ্য সরকার নতুন আইন ঘোষণা করেন। ঘোষণার পরের দিন রাজ্যের প্রায় ৪৫০০০ প্রাইভেট হাসপাতাল এবং ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়া হয়। আইএমএ এর কার্ণাটক শাখার ঘোষণা অনুযায়ী ৬০০০০ এর বেশি ডাক্তার কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। ডাক্তাররা দাবী করেন এই আইনের ফলে তাদের নিজেদের শেল্ফ ডিফেন্সের সর্বশেষ সুযোগটা চলে যাবে। চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত সরকার আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়।

(৬) ২০ মার্চ, ২০১৭ঃ
এক আবাসিক ডাক্তারের উপর হামলার প্রতিবাদে মহারাষ্ট্র রাজ্যের ৪০০০০ ডাক্তার অনির্দিষ্টকালের জন্য স্ট্রাইক করেন। মহারাষ্ট্রের ডাক্তারদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে দিল্লির ১৫০০ ডাক্তার মাথায় হেলমেট পরে দুইটি পালন শুরু করেন। ২০০০০ ডাক্তার একযোগে নেন ছুটি। দিল্লিতে একদিনেই সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ৮০০ অপারেশন স্থগিত করা হয়। পাঁচ দিন পর মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাদনাবিস দোষীদের শাস্তির ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয়ার পর এবং বোম্বে কোর্ট কর্তৃক লিগ্যাল একশন নেয়া হলে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন ডাক্তাররা।

(৭) ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ঃ

ডেঙ্গু জ্বরে এক শিশু মারা যাওয়াকে কেন্দ্র করে পেটানো হয় মুম্বাই এর তিন ডাক্তারকে। এর প্রতিবাদে ১২০০ ডাক্তার স্ট্রাইক করা শুরু করেন। অভিযুক্তদের গ্রেফতারের আগে পর্যন্ত চলে এই ধর্মঘট।

(৮) ২ জুলাই, ২০১৫ঃ

নিজেদের জীবন ব্যবস্থার উন্নয়ন, উন্নত বেতন ভাতা এবং ছুটির দাবিতে মহারাষ্ট্রের ৪০০০ চিকিৎসক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্ট্রাইক করেন

(৯) ২২ জুন, ২০১৫ঃ
মহারাষ্ট্রের ডাক্তারদের মতোই প্রায় একই রকম ১৯ দাবিতে দিল্লির ১৫০০০ ডাক্তার ধর্মঘটে নামেন। দুই দিনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল ১৯ দাবীর সবটাই মেনে নেন এবং বলেন ডাক্তারদের এই দাবী আগেই মেনে নেয়া উচিত ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

(১০) ২৪ অক্টোবর, ২০১৪ঃ
বেতন এবং পদন্নোতির দাবীতে বেঙ্গালুর, মশুর, বেলগুয়াম এবং গুল্বারগার ২৬০০ ডাক্তার কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। ৬ বছরের অভিজ্ঞ ডাক্তারদের বেতন ৬৮০০০ রুপি, ১০ বছরের অভিজ্ঞ ডাক্তারের বেতন ১১০০০০ রুপি করা হলে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

জানতেন ভারতে এমন অবস্থা চলে?
আপনার মিডিয়া কোনোদিন এসব খবর আপনাকে দিয়েছে?

ভারতের ডাক্তারদের নামে তসবিহ জপা ভুলে গিয়ে বলতে পারেন এ আর এমন কী? বাংলাদেশ আর ভারত আলাদা হলো?

ওকে, তাহলে আরেকটু খবর দিই।

এই বছরের পহেলা মার্চ থেকে নিয়ে মাসব্যাপী কর্মবিরতি পালন করেছেন জিম্বাবুয়ের ডাক্তার এবং নার্সরা। নিজেদের বেতন ভাতা এবং নিরাপদ কর্মস্থলের দাবীতে করা এই আন্দোলনের ২১ দিন পর নার্সরা কর্মস্থলে ফিরে ফেলেও পুরো মাসে ডাক্তাররা কোনো কাজ করেননি। এই ধর্মঘট সমগ্র জিম্বাবুয়ে ব্যাপী পালন করা হয়।

একই মাসের ৫ তারিখ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে চলে গেছেন কেনিয়ার ৭০০ ডাক্তার। মেডিকেল স্টাফদের ভুলে ভুল রোগীর উপর ব্রেইন সার্জারি করা এক ডাক্তারের উপর শাস্তির প্রতিবাদে তাদের এই আন্দোলন। এর এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

ভাবছেন এসুব তো গরীব দেশ/ এখানকার ডাক্তাররা তো অসভ্য হবেই। তাহলে কিছু উন্নত গল্প শুনুন।

১। কানাডায় ১৯৬২ সালে ২৩ দিন ব্যাপী ধর্মঘট পালন করেন ডাক্তার- নার্সরা।

২। ১৯৬৪ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল বেলজিয়ামের ফিজিশিয়ান এবং ডেন্টিস্টরা করেন ১৮ দিনের স্ট্রাইক।

৩। ১৯৭৫ সালে যুক্তরাজ্যের সকল কন্সাল্টেন্ট জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট চার মাস ব্যাপী কর্মবিরতি পালন করেন।

৪। ১৯৮৩ সালে ইসরায়েলের সব ডাক্তার অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করেন।

৫। ১৯৮৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ৫০ দিনের কর্মবিরতি পালন করা হয়।

৬। ১৯৯৪ সালে সুইডেনে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করেন ডাক্তাররা।

এ তো গেল গত শতাব্দির কিছু ঘটনা। এই শতাব্দিতে এসে এমন ঘটনা কমেনি, বরং বেড়েছে। কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলি…

১। ২০০৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এক বছর ব্যাপী স্কটল্যান্ড স্ট্রাইক।

২। ২০০৬ সালে জার্মানিতে মার্চব্যাপী স্ট্রাইক।

৩। ২০০৬ সালে ৫ দিন ব্যাপী নিউজিল্যান্ডে স্ট্রাইক।

৪। ২০০৯ সালে সুইজারল্যান্ড স্ট্রাইক।

৫। ২০১০ সালে সুদান স্ট্রাইক।

৬। ২০১২ সালে মারচব্যাপী জার্মানি স্ট্রাইক।

৭। ২০১২ সালে সমগ্র ভারত ব্যাপী স্ট্রাইক।

৮। ২০১৩ সালে জানুয়ারিতে ইউকে জুনিয়র ডাক্তারদের স্ট্রাইক।

৯। ২০১৩ সালের এপ্রিলে জ্যামাইকায় জুনিয়র ডাক্তারদের স্ট্রাইক।

১০। ২০১৪ সালে ইউকে তে আরেক দফা স্ট্রাইক।

১১। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ইউকে মিডওয়েভ স্ট্রাইক।

১২। ২০১৫ সালের এপ্রিলে আয়ারল্যান্ডে মিডওয়েভ স্ট্রাইক।

১৩। ২০১৫ সালে ব্রাজিলে আবাসিক ডাক্তারদের ৪ মাস ব্যাপী ধর্মঘট।

১৪। ২০১৫ সালের ১৮ নভেম্ভর ফ্রান্স ধর্মঘট।

১৫। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর – ২০১৬ সালের জানুয়ারি ইউকে মেডিকেল ছাত্র ধর্মঘট।

১৬। ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডে ৪ মাসব্যাপী জুনিয়র ডাক্তারদের স্ট্রাইক।

১৭। ২০১৬মঘত।র ডিসেম্বরে কেনিয়ায় ধর্মঘট।

১৮। ২০১৬ সালে সুদানে অক্টোবর- নভেম্ভরব্যাপী ধর্মঘট।
:
:
আমার এই লেখা দিয়ে আমি কোনোভাবেই বাংলাদেশের ডাক্তারদের গত দশ বছরে মাত্র দুইবার করা ধর্মঘটকে সমর্থন জানাচ্ছি না কিংবা এটা সঠিক এমন রায় দিচ্ছি না। আমি কেবল এটাই বলতে চাই যে নিজের ব্রেইন এবং বুদ্ধিকে দেশের সাংবাদিকদের কাছে বিক্রি করে দিয়েন না। “এই দেশের ডাক্তাররা খারাপ, এরা রোগী জিম্মি করে, বাকিরা ফেরেশতা” এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন। জগতে কোথায় কী ঘটে, কেন ঘটে একটু খবর রাখুন।

এই লেখার সাথে কোনো লিংক আমি দিচ্ছি না। “এই লেখা ভুয়া এবং গাঁজাখুরি” এমন কমেন্ট করার পূর্ণ স্বাধীনতা আপনাদের দেয়া হলো। ভারতের ডাক্তাররা ঈশ্বর, এমন কিছু বলার সম্পূর্ণ অধিকার আপনার আছে। তবে কৌতূহল বশত বা সত্যিকার অর্থেই যদি কেউ জানতে চান তবে কমেন্টে বা ইনবক্সে জানাতে পারেন। আপনাদেরকে খবরের সোর্স এবং লিংক জানিয়ে দেব।

Related posts

Leave a Comment