মুত্রনালির সংক্রমণ থেকে বাঁচতে চাইলে

ডাঃ তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী:

UTI মেডিকেলীয় পরিভাষায় বলা হয় মুত্রনালির সংক্রমণ। আসুন এ ব্যপারে কিছু তথ্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করবো।

ইউরিনারি ট্রাক্ট যা কিনা কিডনিকে হালকা করে ছুঁয়ে ব্লাডার, ইউরেটার এবং ইউরেথ্রা পর্যন্ত গেছে। মূলত এই রাস্তা ধরেই প্রস্রাব বেরিয়ে আসে আমাদের শরীরের বাইরে। তাই তো শরীরের এই অংশে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা একটু বেশিই থাকে। প্রসঙ্গত, এই বিশেষ ধরনের সংক্রমণকেই চিকিৎসা পরিভাষায় ইউরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশন বা “ইউ টি আই” বলা বলা হয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে সাধারণত যে সমস্ত লক্ষণগুলি প্রকাশ পেয়ে থাকে, সেগুলি হল- তলপেটে ব্যথা, লোয়ার পেলভিসে চাপ অনুভূত হওয়া, বারে বারে প্রস্রাবের বেগ আসা, প্রস্রাবের সময় জ্বালা এবং কষ্ট হওয়া, ইউরিন চেপে রাখতে কষ্ট হওয়া, প্রস্রাবের রং বদলে যাওয়া, ইউরিনে রক্ত আসা প্রভৃতি। এই রোগের চিকিৎসা মূলত অ্যান্টিবায়োটিক এবং পেইন কিলারের সাহায্যই করা হয়ে থাকে। তবে আপনারা সকলেই জানেন যে বারে বারে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শরীরের পক্ষে একেবারেই ভাল নয়। এক্ষেত্রে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির ক্ষতি হওয়ার মারাত্মক সম্ভাবনা থাকে। তাই তো ইউ টি আইকে দূরে রাখতে বিশেষজ্ঞগন আলোচিত নিয়মগুলি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, এই ঘরোয়া টোটকাগুলিকে কাজে লাগালে ইউ টি আই-এর প্রকোপ কমতেও সময় লাগে না। আসুন এবার বিস্তারিত জানতে চেষ্টা করব।

১. শসা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা: একাধিক স্টাডি অনুসারে সারা দিন ধরে বারে বারে অল্প পরিমাণে শসা খেয়ে গেলে শরীরে পানির পরিমান বাড়তে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রস্রাবের মাত্রা বেড়ে যায়। আর এমনটা হওয়া মাত্র শরীরে উপস্থিত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ারাও বেরিয়ে যায়। ফলে সংক্রমণের আশঙ্কা একেবারে কমে যায়।

২. লেবুর মতো সাইট্রিক ফল বেশি করে খেতে হবে: একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে পাতি লেবু এবং কমলা লেবুর মতো সাইট্রাস ফল প্রতিদিন খেলে শরীরে ভিটামিন সি-এর মাত্রা বাড়তে শুরু করে। ফলে প্রস্রাব এত মাত্রায় অ্যাসিডিক হয়ে যায় যে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ারা বেশিক্ষণ বেঁচেই থাকতে পারে না। ফলে ইউ টি আই-এর মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা যায় কমে। এমন ধরনের রোগের থেকে যদি দূরে থাকতে চান, তাহলে প্রতি দিনের খাদ্য তালিকায় লেবুকে অন্তর্ভুক্ত করতে ভুলবেন না

৩. ভুলেও কফি এবং এলকোহল নয়: ইউ টি আই-এ আক্রান্ত হলে ভুলেও বেশি মাত্রায় কফি এবং অ্যালকোহল পান করা চলবে না। কারণ এই ধরনের পানীয় রোগের প্রকোপকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে কষ্ট বাড়ে চোখে পরার মতো। আসলে এই ধরনের পানীয়গুলি শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি যোগায় না, উল্টে দৈহিক ক্ষমতাকে এত মাত্রায় কমিয়ে দেয় যে রোগের প্রকোপ ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়।

৪ খাদ্য তালিকায় অবস্যই দই রাখবেন: আমাদের শরীরের অন্দরে নানা ধরনের উপকারি ব্যাকটেরিয়া থাকে। যারা সময়ে-অসময়ে আমাদের নানাবিধ রোগের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখে। সেই সঙ্গে ইউ টি আই-এর মতো সংক্রমণ থেকে দূরে রাখতেও সাহায্য করে। তাই তো এমন উপকারি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা যাতে বৃদ্ধি পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর এই কাজটা কিভাবে করবেন? এক্ষেত্রে নিয়মিত দই খাওয়ার অভ্যাস করলেই আর কোনও চিন্তা থাকবে না। কারণ দই এমন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় দই অন্তর্ভুক্ত করুন।

৫. দিনে ৩-৪ লিটার পানি পান: একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে ইউ টি আইকে যদি আটকে রাখতে হয়, তাহলে পানির থেকে শক্তিশালী অস্ত্র আর কিছু নেই। সেই কারণে তো মহিলাদের দৈনিক ৩-৪ লিটার পানি পান করতে পরামর্শ দেন চিকিৎসকরো। কারণ যত বেশি করে পানি খাওয়া হবে, তত জীবাণু ইউরিনের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। ফলে সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা যাবে একেবারে কমে যাবে।
প্রসঙ্গত, চিকিৎসকেদের মতে যাদের এই ধরনের সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি, তাদের প্রতি ঘন্টায় এক গ্লাস করে পানি পান করতে হবে। এমনটা করলে ইউ টি আই ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারবে না।

৬. প্রস্রাব চেপে থাকা চলবে না: বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে প্রস্রাব চেপে রাখার প্রবণতা যাদের রয়েছে, তারাই মূলত এই ধরনের রোগে বেশি মাত্রায় ভুগে থাকেন। কারণ প্রস্রাব যখন ঠিক সময়ে শরীরের বাইরে বেরতে পারে না, তখন রিফ্লাক্স করে সম বেগে পিছনের দিকে আসতে থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা যায় বেড়ে। প্রসঙ্গত, এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। তা হল শরীরিক সম্পর্কের পর প্রস্রাব করতেই হবে! কারণ এমনটা না করলে শরীরের এই অংশে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা যাবে বেড়ে। ফলে ইনফেকশনের ফাঁদে পরার সম্ভাবনাও বাড়বে।

৭. ক্র্যানবেরি জুস: একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে এই প্রকৃতিক উপাদানটির শরীরে থাকা পলিফেনল নামে এক ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জীবাণুদের মেরে ফেলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সঙ্গে ই.কোলাই-এর মতো ব্যাকটেরিয়াকে শরীরে প্রবেশ করতে দেয় না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইউ টি আই-এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে কমে যায়। তাই এমন সংক্রমণের থেকে দূরে থাকতে চান তো প্রতিদিন ক্র্যানবেরি জুস খেতে ভুলবেন না যেন!

৮. রসুনের সঙ্গে বন্ধুত্ব না পাতালে কিন্তু বিপদ: বিড়লা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সের গবেষকরা একটি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তাতে দেখা গেছে রসুন হল সেই অস্ত্র, যাকে কাজে লাগিয়ে ইউ টি আই-কে একেবারে বাগে আনা সম্ভব! তাই এমন কষ্টকর রোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে রসুন খাওয়ার অভ্যাস করতেই হবে। প্রসঙ্গত, রসুন যে কেবল সংক্রমণ কমায়, তা নয়, সেই সঙ্গে হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এক্ষেত্রে সকাল বেলা খালি পেটে কাঁচা রসুন যেমন খেতে পারেন, তেমনি রসুন দিয়ে চা বানিয়েও খেতে পারেন। তথ্য সূত্র ইন্টারনেট।

ডা. তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী
কনসালট্যান্ট ইউরোলজিস্ট
এমবিবিএস, এফসিপিএস জেনারেল সার্জারি
এমএস ইউরোলজি।

এপয়নটমেনট নিতে ফোন করুন 02 9135947-48 এই নম্বরে আর হেল্প লাইন 01706401952

 

Related posts

Leave a Comment